মন্দিরের দেওয়ালে যৌনতার ইতিবৃত্ত

কথায় আছে “people  are allowed to piss is public but not allowed for kiss”

আমরা ২০১৭ এর দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে এখনো ‘সেক্স’ শব্দটি নিয়ে হিপোক্রিসিতে ভুগি। সমকাম আমাদের  ভারতীয় সংবিধানেও নিষিদ্ধ,  সমাজেও এটা নিয়ে ট্যাবু কম নেই নেহাত। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ‘দলগতমিলন’,  ‘সমকাম’ এর উপস্থিতি এখনোও সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খাজুরাহো,  কোনারক  মন্দির গুলির দেওয়ালের গায়ে।

 

হিন্দুধর্মই যৌনতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বারবার হিন্দুধর্মে উঠে এসেছে জউন তা বা সেক্স!  কি বিশ্বাস হচ্ছে না তো? একবার তাহলে ঘুরেই আসুন না মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট গ্রামের খাজুরাহো মন্দিরে। প্রাচীন ভারতের বহু মন্দিরে কাম শিল্পও ভাস্কর্য-এ পরিপূর্ণ, এবং তাদেরই মধ্যে অন্যতম হল খাজুরাহো মন্দির।  প্রাচীন ভারতে হিন্দু ও বোদ্ধ ধর্মের রন্ধ্রেরন্ধ্রে কাম বা যৌনতা কে দেখা মিলবে। এবং  তারই নিদর্শন হিসেবে এখনো পূজীত হয় খাজুরাহো মন্দির।

 

খাজুরাহো  আসলে ভারতের মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত একটি ছোট্টগ্রাম। কিন্তু গ্রামটির জন্যে নয় বরং খাজুরাহো পরিচিত এখানকার মন্দিরে ইরোটিক মূর্তিও স্থাপত্যর জন্যে। মূর্তিগুলি প্রায় ১০০০  বছরেরও বেশি পুরানো। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজও ভারতের সাতটি আশ্চর্যর মধ্যে এটি একটি। কেনো ও কিভাবে এই শিল্পগুলিকে জন্ম দেওয়া হয়েছিলো তা নিয়ে এখনো গবেষণা ধোঁয়াশাতেই।অনেক গুলি কল্পকাহিনীও জন্মনিয়েছে এইমন্দির গুলিকে ঘিরে।

 

শোনা যায় এই রাজ্যের এক সুন্দরী রমনীর বসবাস ছিল, নাম হেমবতী। সে একদা রাত্রীবেলা জঙ্গলের গভীরে স্নান করছিলো, হঠাতই চাঁদকে দেখে তার মনে কামনা জাগে এবং তার চন্দ্র দেবতার সাথে সঙ্গমের দরুন জন্ম নেয় চন্দ্রবর্মন।এবং চন্দ্র দেবতার দেওয়া কথা অনুযায়ী চন্দ্রবর্মন মস্ত বড় বীরে পরিণত হয়ও পরবর্তী কালে চান্দেল বংশ স্থাপন করে। এবং মনে করা হয় এই চান্দেল বংশই এই খাজুরাহো মন্দিরের আসল জন্মদাতা।

 

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস প্রাচীনকালে শিব ও অন্যান্য দেব-দেবীরা এখানেই মিলন ক্রীয়ায় লিপ্তহত।এবং এটি তাই একটি পবিত্র স্থান, তাদের সম্মানা র্থেই এই খাজুরাহো মন্দির স্থাপন করাহয়। এ মন্দির কে বলা হয় ‘temple of love ‘….

গোড়ারদিকে  খাজুরাহোতে ৮৫ টি মন্দির ছিলো। হাজার বছরের পরিক্রমায় এখন পড়ে আছে মাত্র ২০টি। বলা হয় এ মন্দির স্থাপন করতে লেগেছিল ১০০ বছর। ৯৫০ সাল থেকে ১০৫০ সাল পর্যন্ত এমন্দিরের শিল্পকর্ম চলে।

 

এই খাজুরাহো মন্দির নিয়ে আরো এক ইতিহাসের কথা জানা যায়। রাজপুত দের সাথে অন্য আরেক অজানা বংশের মিলনের ফলে এই বংশের উতপত্তি ঘটে। এইবংশের প্রথম সদস্য ছিলো চন্দ্রত্রেয় এবং তার নামানুসারেই এই বংশের নাম হয় চান্দেল। তের দশকের পর এরাজ্যের গুরুত্ব কমতে থাকেও ১৪০০ সালে এসে এই রাজ্যের নামো-নিশান হারিয়ে যায়। ঢেকে যায় জঙ্গলে। ধংস হতে থাকে শিল্প। এরপরই ভারতে ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে আসে আর এই খাজুরাহো ব্রিটিশদের নজরে এসে আবারও জেগে উঠতে শুরু করে। ১৮১৮ সালে প্রথম ফ্রাঙ্কলিন নামে এক মান চিত্রাকারের মানচিত্রে খাজুরাহো ঢুকেপড়ে।তবে মন্দিরগুলীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা নির্দিষ্টভাবে দর্শানো সম্ভব হয়নি।

 

তবে আপাতদৃষ্টি দিয়ে দেখলে চান্দেলের এই মন্দির বানানোর পিছনে এক যুক্তিযুক্ত কারণ পাওয়া যায়। আমরা জানি হিন্দুধর্মে কাম বা যৌনতা কে বেশ হেয় করে দেখা হয়,  সাধু-সন্যাসীদের কাছে এই জোউনতা ছিলো ঘোরতর পাপের সমান। তাই প্রায়শই তারা মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে কাম ত্যাগ করতো। অনেকেই এখনোও মনে করেন যৌন কর্মেলিপ্ত হলে ইশ্বর-সাধনা বাধা প্রাপ্তহবে। হয়তো চান্দেল বংশ চেয়েছিলো যৌনতাকে একটা পসিটিভ নজরে মানুষের কাছে পেশ করতে আরসেই উদ্দেশ্যেই হয়তো জন্ম নেয় খাজুরাহো মন্দির এবং এর উপরে খোদাই করা ভাস্কর্য ওকাম-মূর্তি।

 

একবার ছুটির ফাঁকে ঘুরেই না হয় আসুন খাজুরাহো।হতেই পারে খাজুরাহোর দেওয়ালে আরো এক গল্পের খোজ পেয়ে গেলেন !

 

Tags:
or

Log in with your credentials

Forgot your details?