অনির্বান স্যার

বাদাম চাই বাদাম,বাদাম, বাদাম …!!

হকারের  ডাকে  সম্বিত  ফিরে  পেলাম। এতক্ষন  জানলার ওপারে  গাছের  নৃত্য  দেখছিলাম। বাইরের  এই  অপরূপ  প্রাকৃতিক  সৌন্দর্য্য  দেখে  আমার  ছোটবেলার  স্মৃতিচারন করছিলাম। কি সুন্দর ছিল আমাদের  সেই ছোট্ট সবুজ ঘেরা গ্রাম। মূল আকর্ষন ছিল গঙ্গার পাড়ে সবুজ মাঠে দলবেঁধে  ফুটবল  খেলা। পৃথিবীর  সব  আনন্দ এক দিকে আর  কাদা  মাঠে ফুটবল  খেলার  আনন্দ অন্য দিকে। ছোটবেলার  এই  স্মৃতিচারনার  মধ্যে  মনে পরে গেল অনির্বান  স্যারের  কথা। ছাত্র পড়ানোয় স্যারের খ্যাতি ছিল খুব। দূর দূর থেকে সবাই আসত স্যারের কাছে অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি পড়তে। উজ্জ্বল  গৌড় বর্ন, পৌরাণিক যুগের ব্রাহ্মনের মতো দৈব চেহারা ছিল স্যারের। পড়নে  একটা  ধুতি  আর গায়ে একটা চাদর । গলায় ধবধবে পৈতে, ভিষন সুন্দর ছিলেন অনির্বান স্যার। একদিন  দাদার  হাত ধরে গিয়ে  আমিও ভর্ত্তি হলাম স্যারের  ভাঙা  ঘরের ক্লাসে। আমাকে  দেখেই  বলে  উঠলেন  “বাহ!  তুই তো বেশ লম্বা, লম্বা লোকেরা বুদ্ধিমান হয়, বেঁটে রাও হয় কিন্তু ওদের মাথায় বদ বুদ্ধি বেশি থাকে বুঝলি”। বলেই হো হো করে হেঁসে উঠলেন খালি গায়ে ধুতি পরা অনির্বান স্যার। বিয়ে থা করেননি,  একাই রান্না করে খেতেন। তাঁর খ্যাতি থাকলেও সেই খ্যাতির কোন তোয়াক্কা স্যার কোনদিন করতেন না। বলতেন যার যা কাজ সেটা ঠিক মতো করে যাওয়াই মানুষের ধর্ম। ফিজিক্স আর অঙ্কে র ফাঁকে স্যার নানারকম গল্প করতেন। দেশ বিদেশের  কথা, বড় বড় মনীষিদের  কথা। কখনও আবার উদাত্ত কন্ঠে রবীন্দ্রাথের কবিতা। লেখাপড়ার হাত ধরে চলতে চলতে স্যার আমাদের বুঝিয়ে দিতেন পৃথিবীর আসল চেহারার কথা। লোভ, দারিদ্র,  শোষন, পাশবিকতা,  কোন ঘটনার কি কারন  তা আমাদের  মনে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিতেন স্যার। এই জন্য মনে হয় স্যারের কাছে পড়তে এত ভাল  লাগতো। কর্মব্যস্ত  জীবনের  ফাঁকে যখন ভাবি  স্যার আমাদের জন্য এত কিছু করলেন,  যে স্যারের জন্য আজ আমরা এত সফল সেই স্যারকে আমরা কি দিলাম। প্রবাসে থাকি, বাংলার জন্য মন কাঁদে। আত্মিয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবার কথা মনে আসে। সব থেকে বেশি মনে পরে এই ভগবান তুল্য স্যারের কথা। তাই আজ বছর পাচেক পর পূজোর ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় স্মৃতিচারনার পুরোটাই  স্যার কে  ঘিরে। হকারের ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে ভালই হলো। না হলে হয়তো আর নামতে পারতাম না। স্টেশনে নেমে ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখলাম রাত প্রায় ৯ টা। এই সময় রিক্সা বা ভ্যান খুঁজে পাওয় মঙ্গল গ্রহে জলের সন্ধানের মতো। অগত্যা ভরসা ১১ নং বাস। কানে হেডফোন টা দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলাম। বাড়ি ফিরে এতদিন পরে এলে যা হয় অনেকটা সময় চলে গেল কথায় কুশল প্রশ্নে। তারপর ফ্রেশ হয়ে রাতের আহার পর্ব মিটিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত প্রায় ১১ টা। সারাদিন ট্রেন জার্নির ফলে বিছানায় পরতেই ঘুম চলে এল। ঘুম ভাঙল একবারে সকালে কোকিলের ডাকে। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বেরোলাম বাড়ি থেকে। কিছুটা গিয়ে দাড়ালাম পিন্টু দার চায়ের দোকানে। আমাকে দেখে নানা জনের নানা প্রশ্ন। কিরে রিক না !!! কি খবর, তারপর কি খবর বল??  কেমন আছিস?  ভাল করেছিস বাইরে চলে গেছিস,  এখানে যা অবস্থা। বাঙলার ১৩ টা  বেজে গেছে বুঝলি তো। এই সব আপ্যায়ন ইত্যাদির  পর পা বাড়ালাম বকুল তলার দিকে। ওখানেই তেতুঁল গাছ ঘেঁষে গঙ্গার পারে ছিল অনির্বান  স্যারের  সেই বিখ্যাত  একতলা। হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো  পাড়ার  রূপ বদল দেখছিলাম। মোড় ঘুরতেই আমি অবাক,  একি  তেতুঁল গাছ টা নেয়  তো। শিব মন্দিরের পাশ দিয়ে একটু যেতেই আমার মেরুদন্ড দিয়ে ঠান্ডা রক্তের  স্ম্রোত বয়ে গেল। শিব মন্দির পাশেই তো ছিল  আমাদের  মন্দির। কোথায়  গেল সেটা। তার জায়গায় এখন ৪ তলা ফ্ল্যাট বাড়ি। সেখানে ঝুলছে  বড় বড় বেড কভার। তার পাশেই একই রকমের একটা বাড়ি। স্যারের বাড়িটা মানচিত্র থেকে  কেও যেন ইরেজার দিয়ে মুছে দিয়েছে। এঁকেছে অন্যরকমের  ছবি। মনটা ভীষন ভেঙে গেল। গঙ্গার পার ঘেঁষে নতুন রাস্তা হয়েছ, সেখানে এসে দাড়ালাম। মনে নানা প্রশ্নের ঝড়। কোথায়  গেল স্যারের  সেই একতলা যা আমাদের কাছে ছিল মন্দির মসজিদের সমান। কোথায় হারিয়ে গেলেন অনির্বান স্যার। এই সব ভাবতে ভাবতে হঠাং পুরোনো বন্ধু  অপূর্বর  সঙ্গে দেখা। “কিরে রিক না… কি খবর… কতদিন পর দেখলাম। চেহারাটা অনেকটা বদলে গেছে।” একথা সে কথার ফাঁকে ওকে জিগ্যেস করলাম স্যারের কথা। ও পড়ত স্যারের কাছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাজার করার থলি টি নামিয়ে বললো  সে অনেক কথা,  তুই  প্রায়  বছর  ১০  হল  বাইরে চলে গেছিস। এই এক দশকের মধ্যে  অনেক পরিবর্তন  হয়েছে  এখানে। শুধু  বড় শহরে নয় এই ছোট্ট মফসলেও অনেকরকম পরিবর্তন  হয়েছে  রে। হয়তো এটাই  হওয়ার ছিল। আমরা আগে বুঝতে পারিনি। প্রোমোটারের  থাবায়  শুধু  কলকাতা  নয়,  সারা  বাংলায়  এখন পরিবর্তিত আকার ধারন  করেছে। নেতা মন্ত্রি রা বলছে প্রগতি-উন্নয়ন, কিন্তু আমরা বুঝছি কীভাবে বাঙলাটা বাঙালিদের হাত থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা আর কোথাও নেই রে ভাই। না বানিজ্যে না ব্যবসায় না চাকরিতে। অথচ যাদের টাকা আছে তারা কিরকম টাকার জোড়ে আমাদের বুকের ওপর সাম্রাজ্য গড়ছে। এখানে দু-চার দিন থাক সব বুঝতে পারবি। স্যারের বাড়িটা তো জানিস, একবারে গঙ্গার ধার ঘেঁষে ছিল। চারদিক খোলা। এমন লোভনীয় জমি কি হাতছাড়া  করা যায়। স্যার  কে তো চিনিস,  এককথায় না বলে দিয়েছিল। “ চার পুরুষের ভিটে আমার, কোটি টাকা দিলেও হাতছাড়া করব না। একা মানুষ সারাদিন পড়াশোনা নিয়ে থাকি অতো টাকা নিয়ে করবই বা কি”। কথায় যখন হলো না তখন শুরু হলো অন্য উপায়ে উচ্ছেদের চক্রান্ত। রাজনীতির  বড় বড় দাদা রা যাদের আশ্রয় আর প্রশয়ে প্রোমোটার চক্রের বিকাশ তারা স্যারের ওপর নির্মম অত্যাচার শুরু করল। চোখেও কম দেখতেন আর শরীর টাও ভেঙে গেছিল। আগের মতো ছাত্র পড়াতেও পারতেন না। আমাকে ডেকে ছিলেন একদিন। আমাকে দেখে বললেন “আমি কি কিছু করিনি তোমাদের জন্য। আমাকে উচ্ছেদ করে দিতে চায়ছে একদল অর্থ লোভী পিশাচ। স্যার বলছিলেন আর কাঁদছিলেন। তোমরা ছাত্র রা একটু পারোনা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে”। ছা  পোষা  কেরানি আমরা। এই বিশাল পাপ চক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে আমাদের সাহসে কুলোয় নি। তোর কাছে স্বীকার করতে দোস নেই আমরা  স্যারের  সমস্যা  টা নিয়ে  সেই ভাবে  ভাবি  নি  রে। নিজেদের সমস্যা নিয়ে এমন জেরবার হয়ে উঠেছি। চারিদিকে লক আউট জিনিষ পত্রের আকাশ ছোঁয়া দাম, দিশে হারা হেল্পলেস, বিপন্নতায় আমরা স্যারের সমস্যার কথা ভাবতেই পারিনি। স্যার কে তো জানিস। কোন দিন চাকরি করে নি অন্যের হুকুম শুনতে হবে বলে। কয়েকবছর আগে অঘ্রায়ান মাসের রাতে খুব হৈ চৈ শুনে বাইরে এসে দেখি বকুল তলার আকাশ দগদগে লাল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ছুটে পথে নেমে যে দৃশ্য দেখলাম তা কল্পনা করা যায় না রে রিক। দাউ দাউ করে জ্বলছে স্যারের একতলা। পাড়ার লোকেরা  চেষ্টা করেছিল তারা  শুধু স্যার  কে  বাঁচাতে  পেরেছিল। বুক  ফাটা  আর্তনাদে  স্যার চেচাচ্ছিলেন  “ওরে বই গুলো বাঁচা তোরা বই গুলো বাঁচা।”  না। আমরা পারিনি বাঁচাতে। রাগে, দূ্ঃখে,  ক্ষোভে  আমার  হাত পা  অবশ  হয়ে  আসছে। আমি বললাম চুপ কর অপূর্ব চুপ কর। হিরোসিমায় যেদিন বোমা পড়েছিল সেই গল্প স্যার আমাদের শোনাতেন। কেমন করে একটা বিশাল আগুনের গোলা বুক ফাটা আর্তনাদ নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রান নিঃশেষ করে দিয়েছিল। স্যার বলতেন আর আমরা দেখতাম স্যারের চোখ ছলছল করে উঠত। সেই স্যার নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই হিরোসিমা কি করে দেখলেন। কি করে সহ্য করলেন?  অপূর্ব  বললো  রিক স্যার  এখনও  বেঁচে  আছেন  মারা  যাননি। যাবি স্যারের কাছে? আমি  কেঁদে  ফেললাম!  না, যাব না। আমরা কি রকম মানুষ অপূর্ব। স্যারের কাছে  রসদ  নিলাম, বড় চাকরি করলাম, সুখে  শান্তিতে  থাকলাম  কিন্তু  স্যার  কে কি ফিরিয়ে দিলাম??? অপূর্ব  বললো  শোন রিক দেশে  যখন  এসেছিস ই  তো  চল  স্যারের সামনে গিয়ে একবার দাড়ায়। সন্ধ্যেবেলায়  স্কুলে  গেলাম। ছেলেবেলার স্কুল। এখন অবশ্য অনেক বড় হয়ে গেছে। দাড়োয়ানের ঘরের পিছনে আর একটা ঘর। যেখানে আগে থাকত ঘুটে কয়লা সেখানে একটা বিছানার ওপর শির্ণ,  পোড়া  কয়লার  মতো  গায়ে একটা চাদর  জড়িয়ে  বসে  আছেন আমাদের দেবতা তুল্য  অনির্বান  স্যার। স্যারের পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে কেঁদে ফেললাম। কিন্তু  স্যারের  কোন  প্রতিক্রিয়া  হলোনা। অপূর্ব  আমায় তুলে বললো,  স্যার  বেঁচে  আছেন ঠিকই  কিন্তু কোন বোধ  শক্তি  নেই। বুক  ভেঙে  যাচ্ছে, সমস্ত  চেতনা  জুড়ে  কান্না নামছে। নিজের  ওপর ধিক্কারে,  গ্লানিতে,  রাগে  চুরমার  হয়ে  যাচ্ছে  হৃদয়। স্কুলের দাড়োয়ান  স্যারকে এনে রেখেছিল। আমাকে চিনতে পেরে বললো, দাদা দূঃখ করো না। যার  যা  কপাল। স্যার চুচপ করে যাওয়ার আগে বলতেন “যার যা কাজ সেটা ঠিক করে করে যাওয়া মানুষের ধর্ম। আমার কাজ ছাত্র গড়ে তোলা, সেটাই আমি করেছি”। এই যে দাদা তুমি এতদূর থেকে এলে এটাও তোমার ধর্ম। স্যার বসে আছেন, শূন্য দূষ্টি। মনে হলো স্যার বলছেন নিজের কর্তব্য করে যাওয়াটাই হলো জীবন। এই জন্য আমি তোদের এতো কিছু বলি। তোরাও বলবি বড়ো হয়ে। এই প্রত্যেক টা কথা আমার বুকে কষাঘাতের মতো আঘাত করছে।

সমাপ্ত।

 

 

Tags:

or

Log in with your credentials

Forgot your details?